ব্রিটেনে এসিড সন্ত্রাসীদের টার্গেটে বাংলাদেশী মুসলিমরা
ডেস্ক: ব্রিটেনে উগ্র খ্রিস্টানদের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের নতুন অস্ত্র হিসেবে আর্ভিভূত হয়েছে এসিড সন্ত্রাস। আর এ সন্ত্রাসের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠী, বিশেষত ব্রিটিশ-বাংলাদেশী কমিউনিটি। একের পর এক এসিড হামলার ঘটনায় ব্রিটেনজুড়ে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বিরাজ করছে গভীর উদ্বেগ আর চাপা উৎকণ্ঠা। সন্তানরা বাইরে বের হলে ঘরে না ফেরা অবধি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকছেন মা-বাবাসহ স্বজনরা।
বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে গত দেড় মাসে অন্তত আটটি এসিড হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে সর্বশেষ মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) রাতে দুই ব্রিটিশ বাংলাদেশী তরুণ এসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। শুধু তাই নয়, ম্যানচেস্টার ও লন্ডনে চলতি বছর সন্ত্রাসী হামলার পর ব্রিটেনে মুসলমানদের উপর হেট ক্রাইম বা হামলা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেড়েছে। বাস বা ট্রেন স্টেশনে টেনে ধরা হচ্ছে মুসলিম মেয়েদের হিজাব। অনেক ঘটনায় আক্রান্তরা পুলিশে রিপোর্ট না করায় প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না পরিসংখ্যানে।
মঙ্গলবারও (২৫ জুলাই) লন্ডনে ধারাবাহিক এসিড হামলার প্রতিবাদে বাঙালি কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্টদের উদ্যোগে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কাউন্সিলর মাইয়ুম মিয়ার সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সাবিহা কামালী।
ব্রিটেনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নারী মাজ সেলিম। তার বাবা মোহাম্মদ সেলিমকে ২০১৬ সালে ব্রিটেনের বার্মিংহামে খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা হত্যা করে। তিনি মঙ্গলবার বলেন, ‘এসিড হামলা নয়, এখন ব্রিটেনে যা চলছে, তা হলো এসিড সন্ত্রাস এবং এটি বর্ণবাদী হামলা।’
ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটির প্রবীণ নেতা কেএম আবু তাহির চৌধুরী সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘গত ছয় মাসে লন্ডন ও ওয়েলসে চারশ’র বেশি এসিড হামলার ঘটনা মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিসংখ্যানে রয়েছে। ব্রিটেনের শহরগুলোর মধ্যে নিউহাম, বার্কিং ও টাওয়ার হ্যামলেটসে এসিড হামলার ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি। এ তিনটি শহরেই বিপুলসংখ্যক ব্রিটিশ বাংলাদেশীর বাস।’ তিনি বলেন, ‘বাঙালিদের ওপর হামলার ঘটনার সবগুলো যে শুধু হেট ক্রাইম, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এসিড ছুঁড়ে কেড়ে নেয়া হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তির গাড়ি, টাকা-পয়সাসহ সর্বস্ব।’
ইউকে-বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও চ্যানেল আই ইউরোপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী সোয়েব বলেন, ‘বরিস জনসন লন্ডনের মেয়র থাকাকালে নাইফ ক্রাইমের (ছুরিকাঘাত) কথা শোনা গেলেও এসিড হামলার কথা শোনা যায়নি। সম্প্রতি এমন ঘটনা বাড়ছে। এর মধ্যে একই রাতে পাঁচ বার এসিড হামলা হয়েছে পূর্ব লন্ডনে। পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেনের বাংলা টাউনে সম্প্রতি ছুরিকাঘাত করা হয়েছে এক ব্রিটিশ বাংলাদেশীকে। অপরাধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পূর্ব লন্ডনের সাধারণ মানুষও এখন এসব বিষয় নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।’
ফয়সল চৌধুরী আরো বলেন, ‘২০১৪ সালে লন্ডনে এসিড হামলা হয়েছিল দু’শটি। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৩১টি। সেই হিসাবে প্রতি ২০ ঘণ্টায় একটি করে এসিড হামলা হচ্ছে। সম্প্রতি দেড় ঘণ্টার মধ্যে পাঁচবার এসিড হামলার ঘটনাও ঘটেছে। শুধু তাই নয়, এ বছরে গোটা যুক্তরাজ্যে সংঘটিত এসিড হামলার অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে লন্ডনেই।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির উগ্র জাতীয়তাবাদের ধারা অভিবাসী কমিউনিটির ওপর দেশে দেশে নিগ্রহের প্রধান একটি কারণ। ব্রিটেনের পথে-ঘাটে, টিউব স্টেশনে এখন আশঙ্কাজনকভাবে হামলা আর বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। হেট ক্রাইমের ঘটনাগুলো সহনশীলতার বিপরীতে গড়ে তুলছে ঘৃণার দেয়াল। চক্রান্তকারীরা ইসলামের অপব্যাখ্যা সূক্ষ্ম কুটকৌশলে ছড়িয়ে দিয়েছে ব্রিটিশদের মধ্যে।