বড় ধরনের সঙ্কটে পোশাক খাত
ঢাকা: দেশের তৈরী পোশাকশিল্প বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনায় বিদেশী ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে বাংলাদেশে আসা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের পোশাক খাত এগিয়ে নিতে সে দেশের সরকার বড় ধরনের প্রণোদনার ঘোষণা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার খবরে ইউরোপজুড়ে মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ওইসব দেশে পোশাক রফতানী কমে যেতে পারে। এসব কিছুর প্রভাবে ইতোমধ্যে বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের অর্ডার দেয়া কমিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশ থেকে পোশাক রফতানীর পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে পোশাকশিল্পে বিপদসংকেত দেখা দেবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি পাঠানো এক চিঠিতে এসব আশঙ্কার কথা বলা হয়। চিঠিতে সন্ত্রাসবাদী হামলার বিষয়ে ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানীকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, বর্তমানে দেশের পোশাকের বাজার অনেক সেøা গতিতে চলছে। সমসাময়িক অবস্থার কারণে পোশাকের কম দাম দিচ্ছে ক্রেতারা। তাছাড়া অবকাঠামো দুর্বলতাও অনেক ভোগাচ্ছে পোশাক খাতকে। এসব কারণে একদিকে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে পোশাকের দাম কমছে। ফলে পোশাক রফতানীতে এখন লাভের অঙ্ক অনেক কমেছে।
তিনি জানান, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও ভারতের প্রণোদনার কারণে সে দেশে পোশাকের দাম কমে গেছে। যে কারণে ক্রেতারা এখন ভারতমুখী। ক্রেতারা বাংলাদেশ বিমুখ হলে দেশের পোশাক খাতের জন্য তা বিপদসংকেত হিসেবে দেখা দেবে। এসব বিষয়ে তিনি এখনই উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেছেন।
বর্তমানে বিশ্বে পোশাক রফতানীতে শীর্ষে রয়েছে চীন। তারপরই বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে দুই হাজার ৫৪৯ কোটি ডলারের পোশাক রফতানী হয়েছে। ২০১৪ সালে ভারত এক হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বস্ত্র ও পোশাক রফতানী করেছে। পোশাক খাত থেকে রফতানী বাড়াতে সম্প্রতি তারা ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এতে দেশটির উদ্যোক্তারা পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতি স্থাপনে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি পাবেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজ্য সরকার যে কর আদায় করে, পোশাক কারখানার মালিকদের তা ফেরত দেবে। কম সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এসব কারণে আগামী ২০১৮ সালে দেশটি ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বস্ত্র ও পোশাক রফতানীর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সেই সময়ে রফতানী করবে ৪ হাজার কোটি ডলারের পোশাক। ফলে ওই বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ পোশাক রফতানীতে ভারতের পেছনে পড়ে যাবে। সূত্র জানায়, এসব তথ্য জানার পর উদ্যোক্তারাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পোশাক রফতানীতে সামনে এগোতে না পারলে ক্রেতারা চলে যাবে। আর একবার ক্রেতা হারালে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। ক্রেতারা সেখানেই যাবে যেখানে নিরাপত্তা ও মুনাফা পায়। কিন্তু বাংলাদেশে এ দুটি বিষয় নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এ বিষয়ে জানান, সন্ত্রাসবাদী হামলার পর আমরা অনেক ইমেজ সঙ্কটে পড়েছি, যা কাটিয়ে উঠতে নিজেদেরই প্রচারণা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কোনোটিই করা যায়নি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্রেক্সিটের প্রভাব। ভারত পোশাক খাতের জন্য নতুন প্যাকেজ ঘোষণার পর আমরা আরো বেশি প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার কারণে ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে পোশাক রফতানীতে পেছনে ফেলার জন্য পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। ভারতের প্রণোদনা ও সন্ত্রাসবাদী হামলার কারণে পোশাক খাত অনেক পিছিয়ে পড়বে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ হিসেবে গড়ে উঠছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের সন্ত্রাসবাদী হামলার কারণে ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে অন্য দেশমুখী হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারত।
চিঠিতে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদী হামলার পর ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ব্রেন্ড ইউনিকথ তাদের বায়ারদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। এছাড়া নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ইংল্যান্ড থেকে টেসকো ও ফ্রান্স থেকে সিলিও নামের দুটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। গত ১৮ জুলাই-২০১৬ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ইউএস কটন কাউন্সিলের বৈঠক বাতিল করা হয়। গত মাসে দেশী-বিদেশীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত প্রদর্শনী বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে গুলশানের সন্ত্রাসবাদী হামলার কারণে বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা ভীতি তৈরি হওয়ায় নতুন বায়াররা বাংলাদেশে আসতে ভয় পাচ্ছে। ফলে নতুন বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না। যে বাজার রয়েছে সেগুলোই এখন কমে যাচ্ছে, যা দেশের পোশাক খাতের জন্য বড় ধরনের হুমকিস্বরূপ। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরে পোশাক খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, গত জুনের শেষ দিক থেকে ব্রেক্সিটের প্রভাবে ইউরো পাউন্ডের দরপতন হতে থাকে। বর্তমানে ইউরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দার আভাস ফুটে উঠেছে। ফলে আগামীতে ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমতে পারে। এর ধাক্কাটা প্রথমেই বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের পোশাক রফতানীর ৭৩ শতাংশ যাচ্ছে ইউরোপে। এই বড় বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তার বড় ধাক্কা আসতে পারে এই খাতে। ইউরোপীয় অঞ্চলে থাকার সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে যে বাণিজ্য সুবিধা পেত বাংলাদেশ, আলাদা হওয়ার পর তা পাওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে।
পোশাক খাতের সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করে চিঠিতে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হওয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুবিধাগুলো যুক্তরাজ্য থেকে পেতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো। বাংলাদেশ নিটঅয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহ-সভাপতি আসলাম সানি এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ পোশাক রফতানীর বড় একটা জায়গা ইউরোপ। এই বাজার ধরে রাখতে সরকারকে আরো তৎপর হতে হবে।
অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সচেতন মহল বলেছেন, মূলত আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের বাজার দখল করতে হানাদার ভারতের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টরা এসব সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়েছে। যাতে আমাদের দেশ সারা বিশ্বে ইমেজ সঙ্কটে পড়ে। যেন বিদেশী ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা আমাদের দেশে আসতে ভয় পায়। ফলে বিদেশী ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা ভারতমুখী হবে। এটা ভারতীয় ষড়যন্ত্র। সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপি’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুনিরুল ইসলামও বলেছেন- গুলশান হামলা ও সেলাকিয়া হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র এসেছে ভারত হয়ে। তাতেই দেশপ্রেমিক জ্ঞানীরা বুঝে গেছে কি থেকে কি হয়েছে।