প্রকট গ্যাস সঙ্কট শিল্পকারখানায়

ঢাকা: প্রতিনিয়ত দেশে প্রকট হচ্ছে গ্যাস-সঙ্কট। চাহিদার সঙ্গে যোগানের ফারাক বাড়ছে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পকারখানায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। নতুন করে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। এমনকি এ দেশের শিল্পকারখানায় বিনিয়োগকারী বিদেশীরাও হতাশ হয়ে পড়ছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী রফতানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানা রয়েছে বিদেশী মালিকদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হংকংয়ের এক শিল্পমালিক বলেছে, এখানে গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট অনেক বেশি। বিশেষ করে গ্যাসপ্রাপ্তির বিষয়টি চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। সে বলেছে, প্রায় দু’বছর ধরে চেষ্টা করেও গ্যাস সংযোগ মেলেনি। আদৌ মিলবে কিনা সন্দেহ। এছাড়া বিদ্যুতের দামও বেশি বলে সে মনে করে। এই ইপিজেডে আরো বেশ কয়েকটি কারখানা রয়েছে, যারা গ্যাসের সংযোগপ্রাপ্তির চেষ্টা করেও পায়নি। এখন বয়লার চালাচ্ছে কারখানায় উৎপাদিত কাপড়ের ঝুট দিয়ে। ইপিজেডের একটি বৃহৎ কারখানায় কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেছে, গ্যাস-সঙ্কটের বিষয়টি বিবেচনা করে এমন প্রযুক্তির বয়লার স্থাপন করা হয়েছে, যেটি ঝুট পুড়িয়ে চালানো যায়। বাধ্য হয়েই এমনটি করা হয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় তিন হাজার শিল্পকারখানা নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোডবৃদ্ধির আবেদন করে অপেক্ষায় আছে সংযোগের। কিন্তু সংযোগ না পেয়ে অনেক মালিক চরম বেকায়দায় রয়েছেন। উপরন্তু গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় এবং লোডও বৃদ্ধি করতে না পারায় কারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো শিল্পকারখানা সিএনজি স্টেশনের গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন সিলিন্ডার করে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে তারা কোনো রকম শিল্পকারখানা চালিয়ে রাখছেন।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩৫শ’ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু উৎপাদন হয় ২৭শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন ঘাটতি আটশ থেকে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়া প্রতিদিনই গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাড়ছে সঙ্কট। ফলে আবেদন করলেই নতুন গ্যাস সংযোগ মিলছে না। এমনকি বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে। ঠিকমতো গ্যাস পাচ্ছে না।
চাহিদা অনুযায়ী, গ্যাসে বর্ধিত লোডও মিলছে না। গ্যাস-সঙ্কটের কারণে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। শিল্পে সংযোগ দেয়া হচ্ছে খুবই সীমিত আকারে। জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির মাধ্যমে অনেক যাচাই-বাছাই করে দীর্ঘ সময় পরপর কিছু কারখানাকে গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমতি দেয়া হয়। গত মে মাসে এ কমিটি প্রায় দেড় বছর পর ২৭৩ শিল্প প্রতিষ্ঠানে নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ শিল্প নতুন সংযোগ ও ১০৬টিতে গ্যাসের লোড বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়া হয়।
এদিকে এক কথায় দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছে, দেশে এ মুহূর্তে বিনিয়োগের প্রধান বাধা গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট। তারা মনে করছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় দেশী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এমনকি বিদেশী উদ্যোক্তারাও আসা বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া দেশী উদ্যোক্তারাও সম্প্রতি সরকারকে চাপ দিচ্ছে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন দিতে।
তবে সম্প্রতি গ্যাস-সংকট সমাধানে সরকারের উদ্যোগ কী, এমন প্রশ্নে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জ্বালানি সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছে, গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আগামী ৪ বছরে ১০৮টি গ্যাসকূপ খনন করার উদ্যোগ নেয়া হবে। তার মধ্যে চলতি বছরই ২৮টি কূপ খনন করা হবে। এগুলো কিছু বাপেক্স ও কিছু বিদেশী ঠিকাদাররা করবে। এছাড়া গভীর সমুদ্র ব্লকগুলোতেও গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এলক্ষ্যে কয়েকটি সমুদ্র ব্লক ইতোমধ্যে বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি সচিব বেশি জোর দিয়েছে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে। জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, আগামী বছরের মধ্যেই দেশে এলএনজি আমদানি করা গেলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সঙ্কট কিছুটা কমবে।

আপনার মতামত