‘ধনী আরো ধনী, গরিব আরো গরিব হচ্ছে’

ঢাকা: বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে চললেও ধনী-গরিব বৈষম্য কমেনি বলে পর্যবেক্ষণ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডির। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবে’ ধনী-গরিবের সম্পদ বৈষম্য আরও বেড়েছে। কমেছে দারিদ্র্য হ্রাসের হার। শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সিপিডি।

এতে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের পাঁচ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাব। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এরচেয়ে বেশি আয় করছেন, অন্য দিকে আয় কমেছে গরিবদের।

সিপিডির হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় (হাউজহোল্ড ইনকাম) ২০০৫ সালে ছিল ১১০৯ টাকা, যা কমে ২০১৬ সালে ৭৩৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ধনী পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় ৩৮ হাজার ৭৯৫ থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকা।
২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী পাঁচ শতাংশের কাছে, অন্যদিকে ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ ভাগের কাছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়নি। গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। কিন্তু এই শোভন প্রবৃদ্ধির হারের নিচে যে অন্ধকারটি রয়েছে সেটি হল দেশের ভেতরে সে তুলনায় কর্মসংস্থান না হচ্ছে না, দারিদ্র্য বিমোচনের হার শ্লথ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৈষম্য শুধু আয়ে আর ভোগে বৃদ্ধি পায়নি, সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদের বৈষম্য।

এর কারণ হিসেবে ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেয়া, বড় বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করাকে চিহ্নিত করে তারা।
২০০০ থেকে ২০০৫ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে হয়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিশ্লেষণ বলে, যদি একটি দেশের ভেতরে ক্রমান্বয়ে আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা প্রবৃদ্ধির হারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে অর্থাৎ যত বেশি বৈষম্য দেশে আছে সে দেশে প্রবৃদ্ধির হার উপরের দিকে নেয়া তত বেশি সমস্যা।

চলতি বছরের অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা
২০১৮ সালের সব কর্মকা- নির্বাচনমুখী। ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংক খাতে কেলেঙ্কারির বছর। এই খাতে সংস্কার হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। চলতি বছর এমন ম্যাজিক্যাল কিছু ঘটবে না, যাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে। সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক পুঁজিও নেই। গত বছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে চলতি বছরের নির্বাচন বাড়তি ঝুঁকি যোগ করবে। এজন্য রক্ষণশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। ঋণ কমাতে হবে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে চালের দাম কমাতে হবে। নির্বাচনী বছরে বহুমুখী চাপ সামলাতে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রয়োজন।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় দারিদ্র্য কমেনি। সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থানও হয়নি। আবার এই সময়ে সম্পদের বৈষম্যও বেড়েছে। ফলে ২০১৭ সালে সার্বিকভাবে সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে।

ব্যাংকের সামগ্রিক সূচক আরো খারাপ হয়েছে। খেলাপিঋণের পরিমাণ বেড়েছে, শুধু তাই নয়, ঋণের টাকা কয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার জায়গা প্রশাসনিকভাবে বেশ কিছু ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে।
মূল প্রবন্ধে রোহিঙ্গা সম্পর্কে বলা হয়, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। এদের ফিরিয়ে নেয়ার আলোচনা চলছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, প্রতিদিন যদি ৩০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলেও সময় লাগবে কমপক্ষে ৭ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ৪৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর যদি প্রতিদিন ২০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে ১২ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

আপনার মতামত