বাজেট ২০২০-২১: বিদেশী ঋণনির্ভরতা বেড়েছে সাড়ে ৭ গুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ১১ জুন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আসন্ন বাজেটে সরকার ব্যাংক থেকে চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঋণ নিতে চায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিবে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করে জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করা হয়েছিল। তখন অভ্যন্তরীণ খাত থেকে মোট ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।
সূত্র বলছে, নতুন অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নিবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ নিবে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ও অন্যান্য ঋণ নেওয়া হবে আরও ৫ হাজার কোটি টাকার।

অভ্যন্তরীণ ছাড়াও আগামী বছরে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ হাজার ৪ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৫২ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের শুধু মে মাসেই সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৬ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছর (২০১৮-১৯) শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণ ছিল এক লাখ ৮ হাজার ৯৬ টাকা। এতে করে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারের ঋণ ৩৭.৩০ শতাংশ বেড়ে এক লাখ ৭২ হাজার ৩৯২ কোটি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে বেসরকারি খাতের। এখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারবাহিকভাবে কমে যাওয়ার মানে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো জরুরি।

বাজেটে বিদেশী ঋণনির্ভরতা বেড়েছে সাড়ে ৭ গুণ:
৬ বছরের ব্যবধানে বাজেটে বিদেশী ঋণ সহায়তা নির্ভরতা সাড়ে ৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেটে বিদেশী নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। সেখানে আগামী অর্থবছরে এই নিট ঋণ সহায়তা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদেশী ঋণ সহায়তা একটি হিসাব প্রাক্কলন করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি সংস্থার কাছ বাজেটে ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রকল্প সহায়তা হিসেবে বিদেশী ঋণ ধরা রয়েছে ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিদেশী অনুদান খাতে পাওয়া যাবে আরো চার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশী ঋণ ও সুদ পরিশোধে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত, বাজেট সহায়তা পাবার কারণে এবারকার বাজেটে বিদেশী সহায়তার অঙ্ক বাড়ছে। আগামী অর্থবছরে বাজেটে বিদেশী ঋণ অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি হবে।

সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার:

আসন্ন (২০২০-২১) অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। চলতি অর্থবছরে বাজেটে যার লক্ষ্য ছিল ২৭ কোটি টাকা। তবে সরকারের নানা শর্তের কারণে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে। সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্রের ২০ হাজার কোটি টাকাসহ অন্যান্য খাত থেকে মোট ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার। চলতি বাজেটে (সংশোধিত) যা ছিল ১৪ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা।

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে সাত হাজার ৬৭৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম। আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রে জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই ঋণের বিপরীতে সরকারকে ১১ শতাংশের বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।

আপনার মতামত