বন্ধ হয়ে আছে দেশীয় চিনিকল: রমাদ্বান মাস আসার আগেই চিনির বাজারে অস্থিরতা
চট্টগ্রাম সংবাদাদাতা: আসন্ন পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস ও গ্রীষ্মকাল সামনে রেখে অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে দেশের চিনির বাজার। চিনির সরকারি মজুদও বেশ কমে এসেছে। তাছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমানোর সময়সীমাও শেষ হয়ে যাবে চলতি মাসে। এমন অবস্থায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে চিনির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীত মৌসুমের শেষদিকে ধীরে ধীরে চিনির চাহিদা বাড়তে থাকায় বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া আসন্ন রমজান ও শুল্ক কমানোর সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার খবরে চিনির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার খাতুনগঞ্জে প্রতিমণ (৩৭.৩২ কেজি) চিনি বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৬৮০ টাকায়। যদিও এক সপ্তাহ আগে চিনির দাম ছিল ২ হাজার ৫৮০ টাকায়। ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে চিনির দাম বেড়ে মণপ্রতি ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এনবিআর চিনি আমদানিতে শুল্কহার পুনর্র্নিধারণ করে। রমজানের আগে পুরনো শুল্কহারে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কায় কিছুদিন ধরে দেশের পাইকারি বাজারগুলোয় চিনির দাম ফের বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্রে জানা গেছে, বিগত বছরের মতো এবারো সরকারি ছয়টি মিলের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়। সর্বশেষ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া মাড়াই মৌসুমে আখ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ টন। সেখানে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আখ পাওয়া গেছে ৪ লাখ ৪০ হাজার টন। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্ধেক অর্থাৎ ২৪ হাজার ২৯৬ টন উৎপাদন হয়েছে বাকি নয়টি মিলে। ১৮ ফেব্রুয়ারি চালু থাকা মিলগুলোয় সর্বশেষ দিনের মতো চিনি উৎপাদন হয়। এ বছর দেশে রেকর্ড কম পরিমাণ চিনির উৎপাদন হয়েছে। সব মিলিয়ে আগামী জুনের মধ্যে সরকারি মিলের চিনির মজুদ শেষ হয়ে যাবে। উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ডিলার ও চাষীদের চিনি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। যার কারণে আসন্ন রমজান মাসে বাড়তি চাহিদার চিনি বিক্রির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকবে বিএসএফআইসি।
অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গত অক্টোবরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ওই সময়ে চিনি আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ৩০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। চিনি আমদানিতে ধার্য করা নতুন এ শুল্কহার শেষ হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি। চিনির পুরনো শুল্কহারে ফেরত যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসা ও আসন্ন রমজানে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে এখন থেকেই চিনির বাজার বাড়তে শুরু করেছে। তাছাড়া গ্রীষ্ম মৌসুমে বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি এ বছর রাষ্ট্রীয় চিনিকলে উৎপাদন ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পাওয়ার কারণেও চিনির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
খাতুনগঞ্জের চিনি ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বলেন, গ্রীষ্মকাল ও রমজানে চিনির চাহিদা দ্বিগুণ হয়। চিনি আমদানিতে শুল্ক কমানোর সময়সীমাও প্রায় শেষ। তাছাড়া আসন্ন চাহিদা মৌসুমকে কেন্দ্র করে চিনি মজুদের পরিমাণ বেড়েছে। যার কারণে ভোজ্যতেলের মতো বাজার হঠাৎ করেই অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে। এজন্য রমজানের চিনির চাহিদা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্কহার পুনর্র্নিধারণ জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
বিএসএফআইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি ১৫টি মিলে উৎপাদন হয়েছিল ৮২ হাজার ১৪০ টন চিনি। পরের মৌসুমে ৪৮ হাজার ১৩৩ টন হলেও চলতি মৌসুমে হয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৬ টন। এ হিসেবে গত কয়েক বছর রাষ্ট্রীয় মিলগুলোয় চিনির উৎপাদন কমেছে তিন-চতুর্থাংশ। এতে দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটির নিজস্ব কয়েক হাজার ডিলারকে চিনি বরাদ্দ দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। যার কারণে এক সময় দেশে চিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা বিএসএফআইসি অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
তথ্যমতে, গত দুই বছর ধরে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, শ্যামপুর, রংপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়া সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চলতি মৌসুমের শুরুতে বিএসএফআইসির প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ২৫ হাজার ৬৩৮ টন। নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া মৌসুমের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ২৪ হাজার ২৯৬ টন, বিক্রি হয়েছে ২৪ হাজার ৬০৫ টন। তবে বিক্রয় শেষে ২৫ হাজার ৩২৯ টন চিনি মজুদ থাকবে। যার মধ্যে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও মিলস রেশনের জন্য সংরক্ষিত চিনির পরিমাণ ১২ হাজার ৪৩৩ টন। বাকি চিনি প্যাকেট আকারে বিক্রি করবে খুচরা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য।
জানতে চাইলে বিএসএফআইসির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মাযহার উল হক খান বলেন, এক সময় দেশের সরকারি মিলগুলোয় চিনি উৎপাদন দেড় লাখ টনের বেশি ছিল। চাহিদামতো পর্যাপ্ত আখ না পাওয়া, চাষীদের বকেয়া পাওনাসহ গত দুই বছর ছয়টি মিল বন্ধ থাকায় সরকারি চিনির উৎপাদন কমে এসেছে। যার কারণে দেশব্যাপী ডিলার পর্যায়ে চিনি সরবরাহ দেয়া যাচ্ছে না। তবে চাহিদা থাকায় প্যাকেটজাত এক কেজির মোড়কে চিনি ও সংরক্ষিত খাতের চিনি সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে।