চার লাখ টন চাল আমদানি হচ্ছে

ঢাকা: ভিয়েতনাম থেকে সরকারিভাবে ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল ও দুই লাখ টন আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং হয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে। উভয় ধরনের চাল নিয়ে পৃথক দুটি জাহাজ ঋণপত্র খোলার ১৫ দিনের মধ্যেই ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে। বাকি চাল আসবে ৬০ দিনের মধ্যে।

চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে চার লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকার আমদানি করছে আড়াই লাখ টন। বাকি দেড় লাখ টন আমদানি করা হবে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আরো ৫০ হাজার টন আতপ চাল ও ৫০ হাজার টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল আমদানি করতে যাচ্ছে সরকার। চাল আমদানির এসব প্রস্তাব আজ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন পেতে পারে। এর আগে দরপত্রের মাধ্যমে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে এ কমিটি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন স্বাক্ষরিত চাল আমদানির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ বছর হাওরে বন্যা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও ব্লাস্ট রোগের কারণে চালের বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সব অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। এই সময় স্বাভাবিকভাবে চালের দাম নিম্নমুখী থাকার কথা থাকলেও বাজারে চালের দর বেশ ঊর্ধ্বমুখী। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে চাল সংগ্রহে সাড়া পাচ্ছে না। ফলে সরকারের মজুদও কমে গেছে। গত ৭ জুন পর্যন্ত সরকারের গুদামে এক লাখ ৯৮ হাজার টন চাল ও দুই লাখ ৯৪ হাজার টন গম রয়েছে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে সরকারের গুদামে খাদ্য মজুদ মাত্র চার লাখ ৯২ হাজার টন।

খাদ্যসচিব আরো বলেন, ‘এ বছর দেশের অভ্যন্তরীণ চালের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে জরুরিভিত্তিতে সরকারিভাবে চাল আমদানি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ’

সরকারিভাবে (জিটুজি) চাল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা আছে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, চালের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেদিন কেনা হবে, সেদিনকার আন্তর্জাতিক মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, বীমাসহ অন্যান্য খরচ যোগ হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ চাল আমদানি করেছিল প্রায় ছয় বছর আগে, ২০১১-২০১২ অর্থবছরে। ওই সময় ভিয়েতনামের কাছ থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানি করে সরকার। গত বছর বাংলাদেশ চাল রপ্তানি করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জরুরিভিত্তিতে সরকারিভাবে চাল আমদানির জন্য ২৮ মে ভিয়েতনামের প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানানোর পর সে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ভিনাফুড-২-এর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল আসে। তাদের সঙ্গে ৪-৫ জুন বৈঠক করে বাংলাদেশের ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা শেষে প্রতি মেট্রিক টন ৪৩০ মার্কিন ডলার দরে দুই লাখ টন আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। এতে প্রতিকেজি চালের আমদানি মূল্য পড়বে ৩৫ টাকা ৬৯ পয়সা (প্রতি ডলার ৮৩ টাকা হিসেবে)। এতে দুই লাখ টন চাল আমদানিতে খরচ পড়বে ৭১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, বীমাসহ অন্যান্য খরচ যোগ হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ওই বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক বাজারে আতপ চালের দর বেড়েছে। বর্তমানে আতপ চালের দর ভারতে ৪৩০ ডলার, পাকিস্তানে ৪৫৩ ডলার, থাইল্যান্ডে ৪৭৮ ডলার ও ভিয়েতনামে ৪৩৪ ডলার।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, জিটুজি ভিত্তিতে খাদ্যশস্য কেনার চুক্তি হলে তা সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিশ্চয়তা থাকে না। তা ছাড়া ভিয়েতনামের দেওয়া দর চালের আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ অবস্থায় দেশে চালের মজুদ সুসংহত করা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় জরুরি সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য ভিয়েতনাম সরকারের কাছ থেকে জরুরিভাবে দুই লাখ টন আতপ চাল আমদানি করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া ভিয়েতনাম সরকারের কাছ থেকে সরকারিভাবে ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল আমদানি করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে জাহাজভাড়া, বীমাসহ অন্যান্য খরচ বাদে প্রতি টন চালের মূল্য পড়বে ৪৭০ ডলার। এই দরে চাল আমদানি হলে প্রতি কেজির আমদানি মূল্য হবে ৩৯ টাকা। এই দরে ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল আমদানিতে খরচ হবে ১৯৫ কোটি পাঁচ লাখ টাকা।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সিদ্ধ চালের দর প্রস্তাবিত দরের চেয়ে কম। ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে যে প্রস্তাব খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে, সেখানেই উল্লেখ করা হয়েছে যে বর্তমান সময়ে সিদ্ধ চালের দর ভারতে ৪৩০ ডলার, পাকিস্তানে ৪৫৮ ডলার, থাইল্যান্ডে ৪৭৮ ডলার।

আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে দুই ভাগে ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য আজ উঠছে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরভিত্তিক মেসার্স এগ্রোক্রপ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি কম্পানি ৫০ হাজার টন আতপ চাল সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তারা প্রতি টন ৪০৬.৪৮ ডলার দরে এ চাল সরবরাহ করবে। এতে মোট ব্যয় হবে ১৬৮ কোটি ৬৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এই দরে চাল পেলে প্রতি কেজির দাম পড়বে ৩৩ টাকা ৭৩ পয়সা।

এ ছাড়া দরপত্রে অংশ নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মেসার্স সিখবির এগ্রো এনার্জি লিমিটেড নামের আরেকটি কম্পানি ৫০ হাজার টন নন-বাসমতি সিদ্ধ চাল সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাতে প্রতি টনের দর প্রস্তাব করা হয়েছে ৪২৭.৮৫ ডলার। এই দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানিতে খরচ হবে ১৭৭ কোটি ৫০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এতে প্রতি কেজি চালের দাম পড়বে ৩৫ টাকা ৫১ পয়সা।

আপনার মতামত