প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্ত: শামসুদ্দিন মানিকের রায় দেওয়া ১৬৮ মামলার পুনঃশুনানী

উচ্চ আদালতে বিচারপতি মানিকের রায় পুনঃশুনানী

নিউজ নাইন২৪ডটকম, ঢাকা: অবসরে যাওয়ার পরে রায় লেখায় সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ১৬১টি মামলা পুনঃশুনানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের ৬টি মামলাও আবার শুনানি হবে।

প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার অফিসের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের কাছে ১৬১ মামলা রয়েছে। আর বাকি ৭টি মামলা রয়েছে মোজাম্মেল হোসেনের কাছে। বেশিরভাগ মামলার রায় লেখার কাজ শেষ করেছিলেন ওই দুই বিচারপতি। কিন্তু তাদের লেখা রায় গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় প্রধান বিচারপতি মামলাগুলো পুন:শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরপরই প্রস্তুত করা হয়েছে এসব মামলার পেপারবুক।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধান বিচারপতির একান্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বুধবার সাংবাদিকদের  বলেন, গত ২৬ এপ্রিল এসব মামলার পুন:শুনানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

২০১৫ সালের এক অক্টোবর আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। অবসরে যাওয়ার সময় ১৬১টি মামলার রায় লেখার দায়িত্ব তার ছিল। এসব মামলা তার অবসরে যাওয়ার আগেই আপিল বিভাগ বিভিন্ন সময়ে শুনানি গ্রহণ সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত আদেশও জানিয়ে দেন। শুধু পূর্ণাঙ্গ রায় লেখার কাজ বাকি ছিল। আর এমনই এক পরিস্থিতিতে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা গত ১৭ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বক্তব্যে অবসরের পরে রায় লেখাকে সংবিধানপরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।

ওই বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন সময় ধরে রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী।’

অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি বলার ব্যাখ্যায় বিচারপতি সিনহা তার বলেন, ‘কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না।এরপর গত ২২ জানুয়ারি মৌলভীবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ার পর আর কোনো রায় লিখতে দেয়া হবে না। আমাদের দেশে অতীতে এ রকম রায় দিলেও এখন থেকে আর এ সুযোগ দেয়া যাবে না।’

এরপর তীব্র সমালোচনার মুখে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৬৫টি মামলার রায় ও আদেশের কপি হাতে লিখে জমা দেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি আরও কিছু রায় লিখে জমা দেন। বিচারপতি মানিক তার কাছে আর কোনো মামলায় রায় লেখার কাজ বাকি নেই বলে তখন মিডিয়ার কাছে দাবি করেছিলেন। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আরও কিছু মামলার রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল। আর যেসব রায় তিনি হাতে লিখে জমা দিয়েছেন, সেগুলোর অনেক লেখাই অস্পষ্ট। পাশাপাশি আপিল বিভাগের যে বেঞ্চ হতে এসব মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে, সেই বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা এখনও এসব রায়ে স্বাক্ষর করেননি।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো মামলার রায় লেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারপতি রায়টি লেখার কাজ শেষ করার পর অন্য বিচারপতিরা তা দেখে একমত হয়ে স্বাক্ষর করেন। আর বেঞ্চের সব বিচারপতির স্বাক্ষর শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটি রায় হিসেবেও গণ্য হয় না। যেসব মামলা পুন:শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এগুলোর মধ্যে ২০১৩ সালে রায় ঘোষণা করা হয়েছে এমন মামলাও রয়েছে। এছাড়াও অবসরের পরে লেখা রায়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রধান বিচারপতি সবগুলো মামলারই পুন:শুনানির আদেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এসব মামলায় রায় ঘোষণার পর আবারও পুন:শুনানির উদ্যোগ নেয়ায় বিচারপ্রার্থীদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হবে। সময় ও অর্থের অপচয় হবে। তারপরও রায়গুলো আইনসিদ্ধ করতে ও বিতর্ক এড়াতে প্রধান বিচারপতি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গা বাঁচানোর জন্য কেউ দায়সারা রায় লিখে থাকলে তা অবশ্যই বাতিল করতে হবে। তবে একজন বিচারপতির গাফিলতির কারণে যদি রায় লেখা না হয় বা পুন:শুনানি করতে হয় তার দুর্ভোগ কেন বিচারপ্রার্থীদের পোহাতে হবে? তাছাড়া পুন:শুনানিতে তো একই রায় নাও হতে পারে। এটাকে আমি বিচার বিভাগের একটি অরাজকতা হিসেবে দেখি।’