অবৈধ বিদেশী নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান
নিউজ নাইন২৪ডটকম, ঢাকা: দেশে অবস্থান করা অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে সিংহভাগই ভারতীয়। এসব ভারতীয় বা বিদেশীদের যারা নিয়োগ দিয়েছেন সেই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযানে নামছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অভিযানে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সর্বনিন্ম পাঁচ লাখ টাকা বা মোট করের ৫০ শতাংশ জরিমানা আদায় করা হবে। কিংবা এর মধ্যে যে জরিমানার পরিমাণ বেশি সেটি আদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। আজ মঙ্গলবার সকালে এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। বোর্ডের উর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত এক উর্ধ্বতন কর্তকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আয়কর অধ্যাদেশের ১৬৫সি ধারা অনুযায়ী জরিমানা আদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। এজন্য আজকের সভা থেকে টেকসই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই মাঠ পর্যায়ে থেকে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি আরো বলেন, অভিযান পরিচালনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেয়া হবে। যদি কেউ জরিমানা দিতে অস্বীকার করে তাহলে তৎক্ষনিক ওই প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত বিদেশী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার। কিন্তু এনবিআরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশীর সংখ্যা লক্ষাধিক। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে তারা হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্থ পাচার করছেন।
এছাড়া অনেক ভারতীয় নাগরিক দেশীয় অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে যৌথভাবে পোশাক খাতের বায়িং হাউজসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধন নেয়ার কথা থাকলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি নানা খরচ দেখিয়ে অর্থ পাচার করছেন তারা। নিজেদের লভ্যাংশও ব্যাংকিং মাধ্যমে না নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে এমন অবৈধ ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি অর্থবছরে বিদেশীদের কাছ থেকে কর আদায়ে ১৮৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ সংশোধনের করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় বা বিদেশী কোনো কর্মী নিয়োগ দিতে চাইলে অবশ্যই তাদের বিনিয়োগ বোর্ডসহ দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে নিবন্ধিত হতে হবে। করবর্ষের যে সময়েই কোনো বিদেশী একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করুক না কেন, তাদের কর দিতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে সার্কভুক্ত ৬টি দেশের প্রায় সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি বিদেশী নাগরিক বসবাস করছে। এদের মধ্যে পাসপোর্ট ও ভোটার আইডি কার্ড জাল করে ১২ লাখেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকরা কাজ করে মূলত আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে থাকা এসব ভারতীয় নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ এবং ওয়ার্ক পারমিট বলে কিছু নেই। এদের মধ্যে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এ কারণে পোশাক শিল্পের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে নানান সময়ে ঘটে যাওয়া নাশকতায় এদের হাত থাকার প্রবল সন্দেহ রয়েছে। গোয়েন্দাদের হাতেও তথ্য-প্রমাণ আছে। কিন্তু আ’লীগ সরকারের ভারতীয়দের প্রতি নমনীয়তার কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছো না বলেও গোয়েন্দাদের সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ আছে, বিদেশী বিশেষত ভারতীয়দের অনেকেই বাংলাদেশী জাল পাসপোর্ট এবং আইডি কার্ডও ব্যবহার করছে। আবার কেউ কেউ মিথ্যা পরিচয়ে বাংলাদেশের ভোটারও হয়েছে। এসব ভারতীয় নাগরিকদের কেউ কেউ রাজনৈতিক সহিংসতাতেও ভূমিকা রাখছে। এদের অনেকেই রাজনীতির আড়ালে-আবডালে থেকে নানান সহিংস ও নাশকতামূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
এই বিদেশী নাগরিকরা বিশেষত ভারতীয়রা বিভিন্নভাবে আয় করে উপার্জিত টাকার সিংহভাগই অবৈধ পথে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়। ফলে একদিকে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।
সরেজমিনে জানা গেছে, বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসের মধ্যে ভারতীয় দূতাবাসের লোকবলও বেশি। বৈধ এবং অবৈধভাবে বসবাসকারী ভারতীয় নাগকিরদের মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্টস, ক্লিনিক, সিমেন্ট এবং ইপিজেড ব্যবসায় জড়িত। এদের কেউ কেউ ইপিজেডের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান, নার্সিং ও এনজিওতে কর্মরত রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় শতাধিক গার্মেন্টেস মালিক ভারতীয় নাগরিক। আর তাদের মালিকানায় রয়েছে প্রায় সহ¯্রাধিক ফ্ল্যাটবাড়ি।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এসব নাগরিকদের মধ্যে বিশেষত ভারতীয় নাগরিকরা অবৈধ পথেই নিজ দেশে যাতায়াত করে। বর্ডার গার্ড ও পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এক শ্রেণীর সদস্যেদের অনিয়ম-দুর্নীতি ও সখ্যতার কারণে এবং আ’লীগ সরকারের ভারত তোষণনীতির কারণে অবৈধভাবে থাকা এসব নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবৈধভাবে অবস্থানকারী নাগরিকদের বিরুদ্ধে দ্রæত আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে একটি সংস্থা বেশ তৎপর রয়েছে। সংস্থার শীর্ষস্থানীয় এক পদস্থ কর্মকর্তার মতে, নতুন সরকার স্থিতিশীল হলে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হবে।