মুসলিম দেশগুলোতে স্বর্ণমুদ্রা চালুর প্রস্তাব মাহাথিরের
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভবিষ্যতে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়লে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ ব্যবহার বিবেচনা করছে ইরান, মালয়েশিয়া, তুর্কি ও কাতার। শনিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এই তথ্য জানিয়েছেন।
মালয়েশিয়ায় মুসলিম দেশগুলোর সম্মেলন শেষে মাহাথির অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান ও কাতারের অর্থনীতি পরিচালনার প্রশংসা করেন। ভবিষ্যতে যে কোনো হুমকির মোকাবেলায় মুসলিম বিশ্বের স্বাবলম্বী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাহাথির বলেন, বিশ্বের সাক্ষী দেশগুলো একতরফাভাবে এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশগুলোর সবসময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে আমাদের যে কারো ওপর এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
সন্ত্রাসবাদে মদদের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর প্রায় দুই বছর ধরে কাতারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। দোহা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আর সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের ওপর খোদ যুক্তরাষ্ট্র গত বছর থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।
মধ্যযুগে ইসলামি দেশগুলোতে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে মাহাথির বলেন, আমি স্বর্ণের দিনার ও বিনিময় বাণিজ্য ধারণাটি পুনরায় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছি এবং আমরা আশাবাদী যে এটি কার্যকরে আমরা একটি প্রক্রিয়া বের করেত সমর্থ্য হব।
মুসলিম দেশগুলোকে কৌশলে ধ্বংস করা হচ্ছে:
মাহাথির বলেন, মুসলিমরা ধর্ম ও দেশ নিয়ে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। তাদের কৌশলে ধ্বংস করা হচ্ছে, তারা পালিয়েও বাঁচতে পারছে না। অমুসলিম দেশে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলো ও ইসলাম অব্যাহতভাবে গৃহযুদ্ধ ও ব্যর্থ প্রশাসন ও অন্যান্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। এগুলো নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়।
নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহকে সহযোগিতায় একমত হয়েছেন মুসলিম নেতারা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে চার দিনব্যাপী কুয়ালালামপুর সামিটে গোলটেবিল বৈঠক ও সেমিনারে উঠে আসে নির্যাতিতদের কথা। ৫টি দেশের নেতা, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে প্রায় ৪৫০ জন প্রতিনিধি চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন।
সম্মেলনে এসেছিলেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তাইয়েপ এরদোগান, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। তারা সবাই কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের মধ্যে থাকা ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। মুসলিম দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিত্বকারী সৌদিভিত্তিক বৈশ্বিক সংস্থাকে হ্রাস করার জন্য সংগঠন ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) সমালোচনার মধ্যে রয়েছে।
মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, কেউ কেউ কেএল শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ধারণা পোষণ করেছেন এবং নেতিবাচক মতামত ভুল জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে যা ন্যায়সঙ্গত হয়নি।
১৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া ২১ ডিসেম্বর সম্মেলনের সমাপনী ভাষণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, মুসলিম বিশ্ব সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ সংকট উত্তরণে তিনি মুসলিম বিশ্বের নেতাদের ‘বাস্তবায়নযোগ্য‘সমাধান বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আমার পক্ষে এটি উলে¬খ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, বিশেষ করে ইরান, বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার পরেও অগ্রগতি ও বিকাশ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং এটি গর্বের সাথে বিশ্বের এক চতুর্থ সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রকৌশলীর দেশ হিসাবে দাঁড়িয়েছে। কাতারও নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছে এবং ইরানের মতো এটিও এর ওপরে উঠতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রভাবশালীভাবে অগ্রগতি করেছে। ইরানের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে সংকেত ব্যবহারের ইরানি প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদ।
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে মালয়েশিয়া মুসলিম এই দেশটির বিশাল বাজারে শরিক হতে পারছে না বলে মাহাথির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এদিকে কুয়ালালামপুর বৈঠক শুরুর আগে গত বুধবার প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেছেন, মার্কিন চাপের মোকাবেলায় ইরানের সরকার ও জনগণের প্রতিরোধ মালয়েশিয়ার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
নাগরিকত্ব আইনের তীব্র নিন্দায় মাহাথির
এসময় ভারতের নাগরিকত্ব আইনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। সম্প্রতি এই আইনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ চলছে। এই আইনের কারণে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এক ভাষণে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাহাথির। তার মতে, যেখানে প্রায় ৭০ বছর ধরে ভারতীয়রা মিলেমিশে বসবাস করছেন সেখানে এই আইনের প্রয়োজন কি? মাহাথির বলেন, এই আইনের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ-সংঘাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কোনো সমস্যা ছাড়াই যখন সবাই নাগরিক হিসেবে ৭০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে তাহলে এখন এই আইনের প্রয়োজন কি?
এই আইনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ৯৪ বছর বয়সী মাহাথির বলেন, আমি দুঃখিত আমাকে এটা বলতে হচ্ছে যে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ভারত মুসলিমের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি আরও বলেন, আমরাও যদি এমনটা করি তবে কী ঘটবে আমি জানি না। এমনটা ঘটলে এখানে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা বাড়বে। এতে সবাইকে ভুগতে হবে।