১৩ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

ভিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক : দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ভিসি) বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আসায় তাদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। একজন পদত্যাগ করছেন। সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন আরো ১২ জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : আন্দোলনের মুখে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার নাসির উদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। সোমবার দুপুরের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তিনি সেটি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির কাছে হস্তাস্তর করেন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে স্ট্যাটাসের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদক ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে সাময়িক বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। বহিষ্কারের বিষয়ে দেশব্যাপি সমালোচনা হলে তার বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয় প্রশাসন। তবে বুধবার রাতেই উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের পর ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান দিয়েছে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান। সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপাচার্যের এমন কাণ্ডে অবাক হয়ে যান।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সিনেট ভবনে যৌথভাবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রাবি ভিসি ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান দেয়। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে অন্য দেশের স্লোগান কীভাবে দেয় প্রশ্ন তুলে ভিসি অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন অনেকেই। ভিসির বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগ চেয়েছেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যকে আজকের মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম বেধে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার তিনি পদত্যাগ না করলে আগামীকাল বুধ ও বৃহস্পতিবার সর্বাত্মক ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ১৮ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার পাদদেশে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আয়োজিত ‘উপাচার্যকে কালো পতাকা প্রদর্শন’ কর্মসূচিতে উপাচার্যকে পদত্যাগে ২৪ ঘণ্টা সময় বেধে দেন তারা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য তিনবার সম্মানী নিয়েছেন টাঙ্গাইলে অবস্থিত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্য মো. আলাউদ্দিন। কেবল অতিরিক্ত সম্মানী নেয়া নয়, শিক্ষকদের পদোন্নতি, কর্মকর্তা নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়মকানুনের চেয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছাÑঅনিচ্ছাই প্রধান করে দেখেন তিনিÑএমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, জমি ক্রয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে বাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের ব্যাপারে খোদ সরকারি অডিট দল আপত্তি তুলেছে। এর মধ্যে ধানমন্ডিতে কেনা বাড়ির ভেতরের রাস্তা দুইবার কেনার অভিযোগও আছে। বিষয়টি ইউজিসি তদন্ত করছে।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম রোস্তম আলী নিয়মনীতি ভঙ্গ করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আপন ভাগ্নেসহ ২২ জন নিকটাত্মীয়কে চাকরি দিয়েছেন। ভিসি প্রশাসনিক ভবনের অবকাঠামো নির্মাণে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অধিক হারে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ আছে। ফলে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা করছেন না। নির্ধারিত সময়ে প্রশাসনিক ভবনের কাজও এ কারণে শেষ হয়নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় : সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন না। যদিও তার নিয়োগের অন্যতম শর্তই ছিলো ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান। গত বছরের ২৯৫ দিনই তিনি ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সালে ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন ১৩১ দিন। চলতি বছরেও তার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার খুবই কম। এছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি, ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে জনবল নিয়োগ, শিক্ষক ও জনবল নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়ম, সভাপতি হয়েও নিয়োগ বোর্ডে অনুপস্থিত থাকা, অবৈধভাবে গাড়ি বিলাসিতা, অর্গানোগ্রাম লঙ্ঘন করে নিয়োগ, নিয়ম ভেঙে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ, ইচ্ছামতো পদোন্নতি প্রদান, আইন ভেঙে নিয়োগসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন, একাধিক প্রশাসনিক পদ দখল, স্বজনপ্রীতি, ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ নানা বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন উপাচার্য নিজেই।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় : চলতি বছরের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে বিতর্কের সৃষ্টি করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস এম ইমামুল হক। ঘটনার প্রতিবাদে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ক্যাম্পাস। পরে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে উপাচার্যকে ছুটিতে পাঠানো হয়। ছুটিতে থাকা অবস্থায় তার মেয়াদ শেষ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সাময়িক দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। দায়িত্ব গ্রহণের পর কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিচারিতা ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করে বিতর্ক সৃষ্টি করেন উপাচার্য আখতারুজ্জামান। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রত্ব না থাকা ছাত্রলীগ নেতাদের অনিয়ম করে চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তি করার অভিযোগ উঠেছে খোদ উপাচার্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ।

এছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ, একই অভিযোগ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবিপ্রবি) উপাচার্য অহিদুজ্জামান, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে ইউজিসি।

ভিসিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। আমাদের কাজ কেবল তদন্ত শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ ও প্রতিবেদন পাঠানো। আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি না। তবে এটা ঠিক, দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রমাণিত হলে অপসারণই শেষ পদক্ষেপ নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অন্য পদক্ষেপও নেয়া উচিত।

গতকাল সোমবার অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ভিসিদের সতর্ক করে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যা যেন না হয়। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিষয়ে কোনো বার্তা দেবেন কিনা- প্রশ্নে দীপু মনি বলেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালকদের নিয়ে শিগগিরই আমাদের নির্ধারিত একটি সভা করার কথা রয়েছে। এছাড়াও আজকে বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিদের নিয়ে বসেছি, সেখানেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে।

সূত্র : প্রথম আলো, ইত্তেফাক ও বাংলানিউজ