ছয় হাজার নারীকে জরায়ু ক্যান্সারের ভারতীয় ভুয়া ভ্যাকসিন, প্রতারক চক্র গ্রেপ্তার

ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জরায়ু ক্যান্সারের ভ্যাকসিন বা টিকার নামে আমদানি নিষিদ্ধ হেপাটাইটিস-বির টিকা দিয়ে প্রায় ছয় হাজার নারীর সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। গত বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবির সদস্যরা এই প্রতারকচক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে বিষয়টি জানা গেছে।

গত দুই বছরে এই প্রতারকচক্র ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের কাছে টিকা বিক্রি করে প্রায় চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ভুয়া টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কয়েকজন গ্রহীতার শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। অন্যরা ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

গত বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিবির তেজগাঁও বিভাগ এই চক্রের পাঁচ সদস্যকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া ওষুধ ও টিকা প্রদানের সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা হলেন—সাইফুল ইসলাম শিপন (২৬), ফয়সাল আহমেদ (৩২), আল-আমিন (৩৪), নুরুজ্জামান সাগর (২৪) ও আতিকুল ইসলাম (১৯)। এ সময় ১২টি বক্সে ১২০টি হেপাটাইটিস বির আমদানি নিষিদ্ধ।

‘জেনেভ্যাক-বি’ ভ্যাকসিন জব্দ করা হয়।

এ ব্যাপারে ডিএমপির ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, এগুলো নিষিদ্ধ টিকা দিয়ে জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসার এক হাজার ২০০টি ভুয়া সারভারিক্স টিকা তৈরি করা হতো, যার আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে তৈরি এক হাজার ২৫টি ভুয়া সারভারিক্স টিকা উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ, যার মূল্য ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ওষুধ তৈরির একটি যন্ত্র, ৫০ পাতা অ্যাম্পুলের লেবেল (প্রতিটিতে ৪৫টি করে), ১০০টি খালি অ্যাম্পুল, অ্যাম্পুলের ৫০০টি ছিপি, একটি প্রাইভেট কার ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

৩৫০ টাকার ওষুধ ২৫ হাজারে বিক্রি : ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ জানান, তিন বছর ধরে দেশে হেপাটাইটিস বি-এর জেনেভ্যাক-বি ভ্যাকসিন আমদানি নিষিদ্ধ।

কিন্তু ভারত থেকে অবৈধভাবে এই ওষুধ দেশে এনে নারীদের জরায়ু ক্যান্সারের ওষুধ বলে বিক্রি করছে চক্রটি। এই ভ্যাকসিনের বিষয়ে প্রকাশ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন করেছে তারা। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করেছে। চক্রটি ৩৫০ টাকার এক ডোজ জেনেভ্যাক-বি দেশে এনে ১০ ডোজ বানিয়ে জরায়ু ক্যান্সারের ভ্যাকসিন সারভারিক্স বলে প্রতিটি আড়াই হাজার টাকা করে বিক্রি করেছে। দুই বছর ধরে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই প্রতারণা করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

জরায়ু ক্যান্সারের ভুয়া টিকা প্রদান, প্রতারকচক্র আটক

এখন পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার মেয়ের শরীরে এই ভ্যাকসিন দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিটি মেয়ের কাছ থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা করে প্রায় চার কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছে।
হারুন অর রশীদ বলেন, গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম শিপন হেপাটাইটিস বি-এর ভ্যাকসিন জেনেভ্যাক অবৈধ পথে বাংলাদেশে এনে নিজ বাড়িতে মজুদ করতেন। তাঁর সহযোগী কেরানীগঞ্জের হিমেলের কারখানার মেশিনের মাধ্যমে ওই ভ্যাকসিনের অ্যাম্পুল খোলা হতো। এরপর এক মিলি করে ওষুধ রাখা হতো সারভারিক্সের নকল অ্যাম্পুলে। এভাবে একটি জেনেভ্যাক থেকে ১০টি নকল সারভারিক্স তৈরি করা হতো। এই চক্রের আতিকুল, আল-আমিন, ফয়সাল ও সাগরদের মাধ্যমে নকল ওষুধ ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন করে এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধক বলে প্রত্যেক মেয়েকে তিনটি করে ভ্যাকসিন দিত তারা। প্রতিটি আড়াই হাজার করে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে সাত হাজার করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

ক্যাম্পেইন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান : এসব অবৈধ ওষুধ রাজধানীর দারুসসালামের ডা. এ আর খান ফাউন্ডেশন, দক্ষিণখানের আল নূর ফাউন্ডেশন ও টঙ্গীর চেরাগ আলীর পপুলার ভ্যাকসিন সেন্টারের মাধ্যমে ক্যাম্পেইন ও বাজারজাত করা হতো। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে ডিবির তদন্ত চলছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তারা প্রাথমিকভাবে এই অপরাধে জড়িত থাকার স্বীকার করেছে। তাদের চক্রে আরো কারা জড়িত, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ডিবিপ্রধান।

ফাউন্ডেশনগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, চক্রের সদস্যরা ভুয়া ভ্যাকসিন নিজেরাই বাজারে ছড়িয়ে আসছিল। পাশাপাশি কয়েকটি নামকরা ফাউন্ডেশনকে ব্যবহার করে প্রচারণা চালিয়ে ভ্যাকসিন দিত। এই চক্রে জড়িত আরো বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। ভ্যাকসিন আমদানি, প্রচারণা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত সবাইকে শিগগির আইনের আওতায় আনা হবে।

ভ্যাকসিন গ্রহীতা ছয় হাজার নারী :

জরায়ুর ক্যান্সারের ভ্যাকসিনের নামে মোট ছয় হাজার নারী ভুয়া টিকা নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার তাঁদের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন নারীর সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র কথা হয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আবার অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁদের একজন বনশ্রীর মুক্তা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘এই ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত অপারেশন পর্যন্ত করাতে হয়েছে। এখনো প্রায় সময় অসুস্থবোধ করি।’

আরেকজন নারী (৩৫) বলেন, ‘অনেক কষ্টে পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় করে দুটো ডোজ নিয়েছিলাম। কিছুদিন ধরে তলপেটে ব্যথা হচ্ছে। এটা এই ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য হয়েছে কি না বুঝতে পারছি না। তবে তৃতীয় ডোজ আর নেব না।’

দুই সন্তানের জননী ৪০ বছর বয়সী আরেক নারী ভুয়া ভ্যাকসিনের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘হোপাটাইটিস বির টিকা তো আগেই নেওয়া ছিল। এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছি। প্রতারকচক্র জরায়ু ক্যান্সারের নামে আবার হেপাটাইটিস বির ভ্যাকসিন দিল। টাকার টাকা তো গেলই, শারীরিক কোনো ক্ষতি হয় কি না এটাই ভাবছি।’

ঢাকার রামপুরার বাসিন্দা আরেক নারী (২১) বলেন, ‘মাইকিং শুনে এলাকার ওষুধের দোকানের চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে এক বান্ধবীসহ এ পর্যন্ত দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছি। এখনো কোনো সমস্যা হয়নি। একবারও সন্দেহ হয়নি এভাবে প্রচার করে নকল ওষুধ দেবে! এখন প্রতারণার বিষয়ে জানতে পেরে আতঙ্কে আছি। কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না?’

প্রতারকচক্রের বিষয়ে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার গোলাম সবুর কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক দিন আগে বনশ্রীতে ভ্যাকসিন নেওয়ার পর এক নারীর শরীর ফুলে যায়। এতে সন্দেহ হলে তিনি স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দিতে যাওয়া লোকদের আটক করেন। শেষে তারা কৌশলে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়েই এই চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আহমেদুল কবির  বলেন, ‘এই টিকা আমদানি ও সরবরাহকারীদের শনাক্ত করতে ডিবি পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা (চক্র) কী পরিমাণ ওষুধ ব্যবহার করেছে আমার জানা নেই। তবে জড়িতদের শনাক্তের পর তদন্তসাপেক্ষে বলা যাবে।’- কালেরকণ্ঠ

আপনার মতামত